Newsblows বাংলা

নিরপেক্ষ বাংলা খবর

ফ্যাশন

Travel Story Bantony Castle in Shimla Himachal Pradesh ABP Ananda | Travel Story : ঘুরে আসি


Bantony Castle : এখানে কান পাতলে শোনা যায় ইতালির সৈনিকদের ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস, ফিসফিস করে বলা দুঃখের কাহিনি আর চাপা কান্না। যুদ্ধবন্দী সৈনিকের দেশে ফেরার  হাহাকার। প্রাচীন এক কাঠের দুর্গে। দুর্গটা ব্যান্টনি পাহাড়ে। 

কিন্তু ব্যান্টনি পাহাড়টা কোথায় তার হদিশ কিছুতেই পাচ্ছিলাম না। যাকেই জিজ্ঞাসা করি, সেই জানে না বলে মাথা নাড়ে। অথচ আশপাশেই কোথাও হবে বলে বলছে গুগল। শেষে গুগলবাবার হাত ধরে চললাম, আর কী আশ্চর্য, মিনিট দশের মধ্যে পৌঁছে গেলাম। ও হরি ! শিমলা ম্যাল থেকে হাঁটা পথ। আর নামেই পাহাড়, সোজা হেঁটে চলে গেলাম। বুঝলাম, এ হল হায়দরাবাদের বানাজারা হিলসের মত। নামেই পাহাড়, এককালে হয়তো টিলা ছিল। জানলাম, ব্যান্টনি পাহাড় না বলে ব্যান্টনি ক্যাসল (Bantony Castle)  বললে এত কাঠখড় পোড়াতে হত না এখানে আসতে।

শিমলা ম্যাল থেকে যে রাস্তাটা শিমলা কালীবাড়ির দিকে গিয়েছে সে পথে স্ক্যান্ডাল পয়েন্টের খানিক পরেই ব্যান্টনি ক্যাসল। রাস্তার ঠিক পাশেই দেখা যায় প্রাচীন কাঠের তৈরি দুর্গ। গেট পেরিয়ে ঢুকতেই চোখজুড়ানো দৃশ্য। ১৯ হাজার বর্গমিটার এলাকা জুড়ে থাকা ব্রিটিশ আমলের ব্যান্টনি এস্টেট। নৈসর্গিক দৃশ্য বাদে এখানে দেখার মত হল, ১৯ শতকে নির্মিত  দুটি ভবন – ব্যান্টনি দুর্গ এবং ব্যান্টনি কটেজ। কিন্তু ব্যান্টনি আবার কোন সাহেবের নাম ? দুর্গের ইতিহাস পড়ে জানা গেল, ‘ব্যান্টনি’ নামটি ‘বেন্টিঙ্ক’-এর অপভ্রংশ। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক, বৃটিশ শাসিত ভারতের গর্ভনর জেনারেল ছিলেন। শিমলায় তাঁর বাসভবনটি আশেপাশেই কোথাও ছিল। ইংরেজ আমলে শিমলা ছিল ভারতের গ্রীষ্মকালের রাজধানী। সেকারণে শিমলায় গড়ে উঠেছিল প্রচুর রাজপ্রাসাদ।

 

শিমলা শহর

ব্যান্টনি ক্যাসল  একসময়  একটি বিশাল ব্যক্তিগত দুর্গ ছিল। ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন কাঠের তৈরি প্রাসাদটা। দোতলা প্রাসাদটি তৈরি টিউডোর স্থাপত্যের অনুকরণে। অপূর্ব শ্যালট  ডিজাইনে সজ্জিত প্রাসাদের ছাদ বরফ জমা থেকে রক্ষা পেতে ঢালু করা আর মাঝে মাঝে ছোট ছোট বাতাস চলাচলের টাওয়ার বসানো। বিস্তৃত লনের মাঝখানে অবস্থিত ভবনটির সুন্দর কাঠের স্থাপত্য দেখার মত। সেই সুন্দরের মধ্যে লুকিয়ে কান্নার জল। এখানেই রাখা হত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বন্দি ইতালির সৈনিকদের। ব্যান্টনি ক্যাসলে কান পাতলে এখনও যেন শোনা যায় তাদের গুমরে ওঠা কান্না।

 ব্যান্টনি ক্যাসল শিমলা শহরের ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভগুলির মধ্যে একটি।  ১৪৫ বছরেরও বেশি আগে নির্মিত হয়েছিল দুর্গটি। দুর্গটি নির্মিত হওয়ার আগে, এস্টেটে কেবল একটি কটেজ ছিল ক্যাপ্টেন এ. গর্ডান নামে এক সাহেবের।

 

ব্যান্টনি পাহাড় থেকে শিমলা শহর
ব্যান্টনি পাহাড় থেকে শিমলা শহর

 ১৮৮০ সালে, দুর্গটি নির্মিত হয় এবং সিরমোর নামে এক স্বাধীন রাজ্যের মহারাজার গ্রীষ্মকালীন বাসস্থানে পরিণত হয়। হিমাচল প্রদেশের রাজধানী শিমলার ঠিক লাগোয়ায় সিরমোর জেলা।  একসময় এটি একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল।  এখানকার রাজাই তার গ্রীষ্মকালীন আবাসন হিসেবে বসবাসের জন্য বেছে নিয়েছিলেন ব্যান্টনি ক্যাসলকে। হিমাচলের ইতিহাস থেকে জানা যায়, টিইজি কুপার( TEG Cooper ) নামে এক বৃটিশ স্থপতি ব্যান্টনি ক্যাসলের নকশা তৈরি করেন। ১৮৯৮ সাল থেকে ১৯১১ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত সিরমোরের রাজা সুরেন্দ্র বিক্রম প্রকাশ বসবাস করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, সিরমোরের শাসকরা ঔপনিবেশিক সরকারকে সামরিক উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ধর্মশালার কাছে ইয়োলে সমাহিত বেশিরভাগ ইতালীয় যুদ্ধবন্দীদের এখানে রাখা হত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আটক ইতালির সৈনিকদের এখানে কিছুদিন রাখার পর নিয়ে যাওয়া হত অন্যত্র।  কিছু পাঞ্জাবে আর কিছু ধর্মশালায়। তাঁদের কী পরিণতি হয়েছিল তা সবটা জানা যায় না। অনেকেই মারা যান রোগে ভুগে ও এদেশের প্রচন্ড গরমে।

স্বাধীনতার পরপরই, লাহোরে অবস্থিত সংবাদপত্র দ্য ট্রিবিউন, এখানে কাজ শুরু করে এবং পরে চণ্ডীগড়ে অফিস স্থানান্তরিত করে।

ভারতের স্বাধীনতার ঠিক আগে, ব্যান্টনি ক্যাসল দারভাঙার মহারাজার হাতে চলে যায়। ১৯৫৭-৫৮ সালে, দারভাঙার মহারাজা স্যার কামেশ্বর সিং পাঞ্জাব সরকারকে ভাড়ায় সম্পত্তিটি দিয়েছিলেন। পাঞ্জাব পুলিশ এবং পরে হিমাচল পুলিশের বিভিন্ন শাখা কয়েক বছর ধরে ব্যান্টনিকে একটি আবাসস্থল করে তোলে। পুলিশ অফিসারদের মেসও এই প্রাঙ্গণে অবস্থিত ছিল। ব্যান্টনিতে যখন হিমাচল প্রদেশ পুলিশের সদর দপ্তর ছিল, তখন বিশিষ্ট স্থানীয় ব্যবসায়ী রামকৃষ্ণ অ্যান্ড সন্সের পরিবার এই সম্পত্তিটি কিনে নেয়। ১৯৯৯-২০০০ সালে পুলিশ সদর দপ্তর শহরের একটি সরকারি ভবনে স্থানান্তরিত হয়, কিন্তু রাজ্য সরকারের ঐতিহ্যবাহী ভবনটি অধিগ্রহণের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

অবশেষে, ২০১৬ সালে, ছয়বারের মুখ্যমন্ত্রী বীরভদ্র সিং ১৯,০০০ বর্গমিটারের এই সম্পত্তি  অধিগ্রহণের অনুমোদন দেন। সরকার এর ব্যক্তিগত মালিকদের ২৭ কোটি টাকা প্রদান করে। এই ঐতিহাসিক ভবনটি শিল্প ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়।

 

শিমলা ম্যাল থেকে ব্যান্টনি ক্যাসেল যাবার রাস্তা
শিমলা ম্যাল থেকে ব্যান্টনি ক্যাসেল যাবার রাস্তা

 প্রায় ২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে পুনরুদ্ধার করা এই দুর্গে প্রায় ৩,৭০০ বর্গমিটার এলাকায় একটি বহুমুখী হল, শিল্প ও কারুশিল্প কেন্দ্র এবং লাইট অ্যান্ড সাউন্ড প্রদর্শনী করা হয়েছে। শতাব্দী প্রাচীন কাঠের দুর্গটির গঠন রূপকে প্রায় অবিকৃত রেখেই সংস্কার করা হয়েছে।  পুরনো হয়ে গেলেও প্রাসাদের কাঠগুলো ছিল মজবুত। সেগুলোকে পরিষ্কার করে পালিশ করার পর বর্তমানে ক্যাসেলের রূপ খুলেছে। 

শিমলার অন্যতম ডিজিটাল মিউজিয়াম ব্যান্টনি ক্যাসল। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেখানে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড এর মাধ্যমে শিমলার ইতিহাস তুলে ধরা হয়। ৩০ মিনিটের লাইট অ্যান্ড সাউন্ড অনুষ্ঠান প্রতিদিন দুবার- হিন্দি এবং ইংরেজিতে হয়। শিমলার  পর্যটকদের জন্য একটি প্রধান আকর্ষণ । অনুষ্ঠানটি ভারতের স্বাধীনতা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে দুর্গ এবং শিমলা যে ঘটনাগুলির সাক্ষী ছিল সে সম্পর্কে দর্শকদের জানায়।  ব্রিটিশরাজ শিমলাকে গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হিসাবে কীভাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল তার গল্পও বর্ণনা করে।

“হ্যালো, আমি ব্যান্টনি ! এসো, আমার অতীতের এক ঘটনাবহুল ইতিহাসের মধ্য দিয়ে তোমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য আগামী কয়েক মিনিট আমার সঙ্গে থাকো।”  অভিনেতা অনুপম খেরের কণ্ঠে সিমলার ১৪৩ বছরের পুরনো ব্রিটিশ আমলের ল্যান্ডমার্ক – ব্যান্টনি দুর্গে খোলা আকাশের নিচে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শোর জন্য জড়ো হওয়া দর্শকদের স্বাগত জানায়। একসময় ভেঙে পড়া এই স্মৃতিস্তম্ভ দুর্গটি এখন আলোয় ঝলমল করছে।

কিন্তু,  সেই হতভাগ্য যুদ্ধবন্দী সৈনিকদের আত্মা নাকি এখনও ঘুরে বেড়ায় ব্যান্টনি ক্যাসলের আনাচে-কানাচে।  নির্জন এক কোণে হয়তো মাঝে মাঝে শোনা যায় অশরীরী কোনও কান্নার আওয়াজ।  এক বুক স্বপ্ন নিয়ে জীবন শুরু করার আগেই যুদ্ধে যাদের নিভে গিয়েছে সমস্ত স্বপ্ন, তাদেরই অতৃপ্ত আত্মা নাকি ঘুরে বেড়ায় রাতের অন্ধকারে। 

 

ব্যান্টনি কটেজ
ব্যান্টনি কটেজ

কীভাবে যাবেন

শিমলা ম্যাল থেকে যে রাস্তাটা শিমলা কালীবাড়ির দিকে গিয়েছে সে পথে স্ক্যান্ডাল পয়েন্টের খানিক পরেই ব্যান্টনি ক্যাসল। পায়ে হাঁটা দূরত্ব। মিউজিয়াম খোলা সকাল ১০ থেকে বিকাল ৫। প্রবেশমূল্য ৫০ টাকা জনপ্রতি। সন্ধ্যেবেলা জনপ্রতি ১০০ টাকার টিকিটে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো। শীতকালে বিকেল ৫.৩০ থেকে আর গরমে রাত ৮ থেকে। 

ছবি : লেখক

অতিরিক্ত তথ্যসূত্র :  ১. পর্যটন বিভাগ, হিমাচল প্রদেশ

 

ব্যান্টনি ক্যাসল
ব্যান্টনি ক্যাসল



Source

LEAVE A RESPONSE

Your email address will not be published. Required fields are marked *